Loading...

সম্রাটের গায়ে সোনা, মানুষের কাঁধে বোঝা
হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের ‘সম্রাটের নতুন পোশাক’ গল্পে সম্রাটের নগ্নতা প্রকাশ করতে একটি শিশুর দরকার হয়েছিল। ফ্রান্সের স্ট্রাসবার্গে সেই ভূমিকায় হাজির হয়েছে একটি ভাস্কর্য। সেখানে ‘সম্রাটের’ গায়ে পোশাক নেই, আছে সোনার প্রলেপ। তিনি নিজের পায়ে হাঁটছেনও না; তার ভার বইছেন অন্য একজন। ক্ষমতার জৌলুশ ওপরেই থাকছে, নিচের মানুষটির ভাগে পড়ছে বোঝা।


হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের ‘সম্রাটের নতুন পোশাক’ গল্পে সম্রাটের নগ্নতা প্রকাশ করতে একটি শিশুর দরকার হয়েছিল। ফ্রান্সের স্ট্রাসবার্গে সেই ভূমিকায় হাজির হয়েছে একটি ভাস্কর্য। সেখানে ‘সম্রাটের’ গায়ে পোশাক নেই, আছে সোনার প্রলেপ। তিনি নিজের পায়ে হাঁটছেনও না; তার ভার বইছেন অন্য একজন। ক্ষমতার জৌলুশ ওপরেই থাকছে, নিচের মানুষটির ভাগে পড়ছে বোঝা।
ডেনমার্কের শিল্পী জেনস গালচিওটের ‘অরেঞ্জ প্লেগ’ ভাস্কর্যে তুলে ধরা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। শিল্পীর হিসাবে, তামার তৈরি কাজটির উচ্চতা ২ দশমিক ৬ মিটার, প্রায় সাড়ে আট ফুট; আবরণে রয়েছে ২৩ ক্যারেট সোনার পাত। ডেনিশ ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য পার ক্লসেনের আয়োজিত প্রদর্শনীতে স্ট্রাসবার্গের পার্লামেন্ট ভবনে এটি রাখা হয়েছে।
ভাস্কর্যের এক হাতে গলফ ক্লাব, অন্য হাতে ন্যায়বিচারের পাল্লা। সঙ্গে পৃথিবীর আদলে গলফ বল। নিচে তার ভার বহন করছেন অপেক্ষাকৃত ছোট এক মানুষ। শিল্পীর ব্যাখ্যায়, এই দৃশ্য ক্ষমতা, সম্পদ ও সুবিধা নিজের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে আটকে রাখার সমালোচনা। পৃথিবী এখানে খেলার সরঞ্জাম হয়ে উঠেছে; আর সেই খেলার ভার অন্যের কাঁধে।
রূপকথার সম্রাটও নিজের মহিমায় এতটাই মুগ্ধ ছিলেন যে প্রতারণার ফাঁদ চিনতে পারেননি। তাকে বোঝানো হয়েছিল, বিশেষ পোশাক অযোগ্য মানুষের চোখে দেখা যায় না। ফলে পোশাক না দেখেও সবাই প্রশংসা করেছিলেন। সত্য বলা সেখানে নিজের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ ডেকে আনার ঝুঁকি। সম্রাটের দরবারে তাই চোখের চেয়ে চাকরি এবং বিবেকের চেয়ে আনুগত্য বেশি কার্যকর হয়ে উঠেছিল।

অ্যান্ডারসনের গল্পের রাজনৈতিক ধার এখানেই। একজন শাসকের আত্মপ্রবঞ্চনা টিকে থাকে অনেক মানুষের সুবিধাজনক নীরবতায়। গালচিওট সেই সম্পর্ককে আধুনিক ক্ষমতার সামনে দাঁড় করিয়েছেন। তার অভিযোগ, ট্রাম্পের নীতি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনেক রাষ্ট্র ও সংস্থা শুল্ক, তহবিল কমানো কিংবা অন্য প্রতিক্রিয়ার ভয় পায়। সেই আশঙ্কার কথাই ভাস্কর্যের মাধ্যমে প্রকাশ্যে তুলতে চেয়েছেন তিনি।
ভাস্কর্যের সঙ্গে থাকা বার্তার বাংলা ভাবার্থ, অন্যের পিঠে বসা শাসক সাহায্যের জন্য সবকিছু করতে প্রস্তুত, শুধু সেখান থেকে নামতে রাজি নন। ব্যঙ্গের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ অংশ এখানেই। সাহায্যপ্রার্থীর কষ্ট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, কিন্তু কষ্টের ওপর বসে থাকা ক্ষমতার অবস্থান বদলাচ্ছে না। নিচের মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে; ওপরের মানুষের আরাম ছাড়ার প্রতিশ্রুতি নেই। এই ব্যঙ্গের ক্ষমতাবান মানুষটি সহমর্মিতার ভাষা জানেন। শুধু নিজের আসন ছাড়ার ভাষাটি শেখেননি। সে কারণেই হাসির আড়ালে দায়িত্ব ও ন্যায়বিচারের কঠিন প্রশ্নগুলো থেকে যায়।
এই প্রতীকের বাস্তব পটভূমি ট্রাম্পের জলবায়ুনীতি। ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি ক্ষমতায় ফিরে তিনি প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন। জাতিসংঘের নথি অনুযায়ী, প্রত্যাহার কার্যকর হয় ২০২৬ সালের ২৭ জানুয়ারি। একই নির্বাহী আদেশে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন পরিকল্পনা বাতিল এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিশ্রুতি বন্ধের নির্দেশও ছিল। ফলে শিল্পীর প্রতিবাদ নির্দিষ্ট নীতিগত সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত।
ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি, আন্তর্জাতিক পরিবেশগত চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও করদাতার স্বার্থ আগে আসতে হবে। এই অবস্থানের বিপরীতে গালচিওটের প্রশ্ন যৌথ দায়িত্ব নিয়ে। একটি রাষ্ট্র নিজের দায় কমিয়ে ফেললে পৃথিবীর সমস্যাটিও ছোট হয়ে যায় না। পৃথিবীকে গলফ বলের মতো হাতে রাখা যায় ভাস্কর্যে; বাস্তবে তার পরিণতি নিজের সীমানার মধ্যে আটকে রাখার সুযোগ নেই।

নির্বাহী আদেশের ভাষায় বিষয়টি জাতীয় স্বার্থ; ভাস্কর্যের ভাষায় অন্যের কাঁধে বোঝা। এই দুই ভাষার দূরত্বই প্রদর্শনীর রাজনৈতিক শক্তি। আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত যে দেশের, তার যুক্তি শুনতে হয়। দায়িত্বের ভাগ কমে গেলে কার ওপর বাড়তি চাপ পড়ে, সেই প্রশ্নও করতে হয়। সোনালি অবয়বটি দর্শককে ঠিক এই অস্বস্তির সামনে দাঁড় করায়।
আয়োজক ক্লসেনও বিতর্ক এড়িয়ে যেতে চাননি। তার বক্তব্য, ভয় পেয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়া যায় না; কোনো নেতা এমন ব্যঙ্গ সহ্য করতে না পারলে বিশ্বমঞ্চে তার অবস্থান নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। এখানে প্রদর্শনীটির আরেকটি তাৎপর্য তৈরি হয়। ক্ষমতার সঙ্গে মতবিরোধ জানাতে শুধু কূটনৈতিক বাক্য লাগে না; কখনো একটি স্থির ভাস্কর্যও রাজনৈতিক ভাষার অস্বস্তিকর কাজটি করে ফেলে।
ক্লসেনের আয়োজন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ভেতরে ট্রাম্পবিরোধী রাজনৈতিক সমালোচনার একটি প্রকাশ। শিল্পী ও আয়োজক এখানে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন। পার্লামেন্টের ব্যস্ত সংযোগস্থলে ভাস্কর্যটি রাখায় সদস্য, কর্মকর্তা এবং দর্শনার্থীরা সেই বক্তব্যের মুখোমুখি হচ্ছেন। রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের হিসাব যেখানে ভাষাকে মেপে দেয়, শিল্প সেখানে একটি দৃশ্য দিয়েই বিতর্ক সামনে আনছে। সম্রাটের পোশাকের প্রশংসা না করেও যে দাঁড়িয়ে থাকা যায়, প্রদর্শনী সেটিও মনে করিয়ে দেয়।
ভাস্কর্যটি এর আগে ব্রাজিলের বেলেমে কপ৩০ জলবায়ু সম্মেলন এবং জার্মানির মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের সময় প্রদর্শিত হয়েছে। স্ট্রাসবার্গের প্রদর্শনী ৮ অক্টোবর পর্যন্ত চলার কথা। স্থান বদলালেও এর প্রশ্ন একই থাকছে: নেতৃত্বের দাবি করা ব্যক্তি দায়ও নিচ্ছেন কি না। সোনার পাত তাই কেবল সাজসজ্জা নয়; ক্ষমতার আত্মপ্রদর্শন ও দায়িত্বের ব্যবধানকে দৃশ্যমান করার শিল্পকৌশল।
অ্যান্ডারসনের শিশুটি সম্রাটের পোশাকের সত্য প্রকাশ করেছিল। গালচিওটের ভাস্কর্য সেই গল্পে আরও একজনকে সামনে আনে—যিনি সম্রাটের ভার বইছেন। তার জন্য শাসকের পোশাক নিয়ে হাসাহাসির চেয়ে জরুরি পিঠের বোঝা কমা। স্ট্রাসবার্গে তাই ব্যঙ্গের আসল লক্ষ্য নগ্ন শরীরের দৃশ্যের বাইরে। ক্ষমতার দাবি যত উঁচু, দায়িত্ব বহনের ইচ্ছাও তত বড় কি না।
নবোদয়/ এসএন/ জেডআরসি/ ০৮ অক্টোবর ২০২৬