Loading...

চলতি বছর আমদানির লক্ষ্যমাত্রা ৯ লাখ ৫০ হাজার টন
ভারত এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী, তবে মিয়ানমার ও ভিয়েতনামেও বাড়ছে নির্ভরতা; বৈশ্বিক আবহাওয়া ও রপ্তানি নীতি বদলালে কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?


বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বড় চাল উৎপাদক দেশ। বছরে প্রায় চার কোটি টনের কাছাকাছি চালের চাহিদার বেশির ভাগই দেশের কৃষকের উৎপাদন থেকে আসে। তারপরও বাজার স্থিতিশীল রাখা, সরকারি মজুত পূরণ এবং উৎপাদনে সাময়িক ঘাটতি সামাল দিতে বাংলাদেশকে মাঝেমধ্যে বিদেশ থেকে চাল আনতে হয়। এ আমদানির পরিমাণ মোট চাহিদার তুলনায় খুব বড় নয়, কিন্তু এর উৎসের ধরন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রয়োজনের সময় দ্রুত চাল আনতে বাংলাদেশ কয়েকটি নির্দিষ্ট দেশের ওপরই বেশি নির্ভর করে, যার মধ্যে ভারত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
চলতি অর্থবছরের জন্য খাদ্য অধিদপ্তর ৯ লাখ ৫০ হাজার টন চাল আমদানির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে। এর মধ্যে ৯৭ হাজার টন আতপ চাল এবং বাকি অংশ সেদ্ধ চাল। গত অর্থবছরে ভারত থেকেই প্রায় ৬ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছিল। সেই হিসাবে শুধু ভারতের সরবরাহই চলতি লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৬৩ শতাংশের সমান। যদিও এটি লক্ষ্যমাত্রার তুলনা, মোট বাস্তব আমদানির হিসাব নয়। তবু সংকটের সময় বাংলাদেশের চালের বাজার কোন উৎসের ওপর কতটা নির্ভরশীল, তার একটি ধারণা পাওয়া যায়।
তবে বাংলাদেশ এককভাবে ভারতের ওপর নির্ভর করে নেই। সাম্প্রতিক সরকারি ক্রয়েই মিয়ানমার থেকে ১ লাখ টন এবং ভিয়েতনাম থেকে একই পরিমাণ চাল আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আগের সরকারি আমদানিতেও ভারত, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম ও পাকিস্তান এই কয়েকটি দেশ ছিল প্রধান উৎস। অর্থাৎ বাংলাদেশ সরবরাহের বিকল্প তৈরি করছে, কিন্তু বিকল্পের সংখ্যা যতটা আছে, বাস্তবে দ্রুত আমদানির সক্ষমতা ও দামের প্রতিযোগিতা ততটা সমান নয়।
ভারতের গুরুত্বের প্রধান কারণ তার ভৌগোলিক অবস্থান ও বড় উৎপাদন সক্ষমতা। স্থলপথে সীমান্ত দিয়ে অল্প সময়ে চাল আনা যায়, ফলে বৈশ্বিক বাজারে হঠাৎ দাম বেড়ে গেলেও ভারত থেকে আমদানি তুলনামূলক দ্রুত করা সম্ভব। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা অতীতে বলেছেন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম বা মিয়ানমার থেকে চাল আনতে পরিবহন ব্যয় ও সময় বেশি হওয়ায় একই চালের আনয়ন খরচ বেড়ে যেতে পারে। ২০২৬ সালের শুরুতেও বেনাপোল দিয়ে ভারতীয় চাল আসার ঘটনায় দেখা গেছে, আমদানিকারকের হিসাবে বন্দরে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতি কেজির খরচ ছিল প্রায় ৫০ টাকা।
কিন্তু সরবরাহের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, প্রধান রপ্তানিকারক দেশের নিজস্ব পরিস্থিতি বদলে গেলে বাংলাদেশের আমদানির খরচ ও সময় দুটিই পাল্টে যেতে পারে। এ বছর ভারতেই তার উদাহরণ দেখা যাচ্ছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ভারতের চাল উৎপাদন প্রায় ১০ মিলিয়ন টন কমে ১৪৪ মিলিয়ন টনে নামতে পারে। অতিরিক্ত বৃষ্টির ঘাটতি, গ্রীষ্মকালীন ধানের আবাদ কমে যাওয়া এবং জলাধারে পানি কমে যাওয়াকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ভারতের সরকারি মজুত ১ সেপ্টেম্বর ৫ কোটি ৯৬ লাখ টন থাকায় দেশটি এখনই রপ্তানি বন্ধ করে দেবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
এখানে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো আজকের বাজার নয়, পরবর্তী সংকটে বিকল্পের বাস্তব সক্ষমতা। ভারত রপ্তানিতে কোনো নতুন বিধিনিষেধ দিলে বা দেশটির অভ্যন্তরীণ দাম দ্রুত বাড়লে বাংলাদেশ কি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মিয়ানমার, ভিয়েতনাম বা থাইল্যান্ড থেকে একই পরিমাণ চাল আনতে পারবে? শুধু কাগজে বিকল্প দেশ থাকা আর বাস্তবে বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত থাকা এক বিষয় নয়।
আন্তর্জাতিক বাজারও এখন পুরোপুরি নিশ্চিন্ত নয়। এফএওর আগস্টের পর্যালোচনায় এশিয়ার কয়েকটি দেশে চালের দাম মাসিক ভিত্তিতে বেড়েছে। ভিয়েতনামে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় এবং ফসল কাটায় বিলম্ব দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি করেছে। থাইল্যান্ডে চালের দাম গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি ছিল। এর সঙ্গে শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবের আশঙ্কাও যুক্ত হয়েছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বলছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর–নভেম্বর সময়ে এল নিনো আরও শক্তিশালী হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে এবং নভেম্বর–ডিসেম্বরে এর তীব্রতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে যেতে পারে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই প্রবণতা ২০২৭ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত টিকে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এল নিনো নিজে কোনো একটি দেশের চাল উৎপাদন কতটা কমাবে, তা আগে থেকে নির্দিষ্ট করে বলা যায় না; কিন্তু দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার ধরন বদলে দিতে পারে, যা ধান উৎপাদন ও সেচব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের নিজস্ব উৎপাদনও অবশ্য এই মুহূর্তে বড় ধরনের সংকেত দিচ্ছে না। এফএওর সেপ্টেম্বরের মূল্যায়নে ২০২৬ সালের বোরো উৎপাদন প্রায় ৩ কোটি ১৯ লাখ টন এবং আউশ প্রায় ৪১ লাখ টন হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। দেশের সরকারি খাদ্য মজুতও সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ২৩ লাখ ৫৯ হাজার টনে পৌঁছেছে, যার মধ্যে চাল রয়েছে প্রায় ২০ লাখ ৩৬ হাজার টন। অর্থাৎ তাৎক্ষণিকভাবে চালের ঘাটতির পরিস্থিতি নেই।
তাই বাংলাদেশের ঝুঁকিকে এখনই ‘চাল সংকট’ বলা যাচ্ছে না। বরং আসল বিষয় হলো সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা। দেশের উৎপাদন ভালো থাকলে এবং সরকারি মজুত পর্যাপ্ত থাকলে আমদানির চাপ কম থাকে। কিন্তু বন্যা, খরা বা উৎপাদন ঘাটতির সঙ্গে যদি একই সময়ে ভারত বা অন্য প্রধান রপ্তানিকারক দেশের উৎপাদন কমে যায়, রপ্তানি নীতি বদলায় কিংবা পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়, তখন বাংলাদেশের হাতে দ্রুত ব্যবহারযোগ্য বিকল্প কতটা থাকবে সেটিই বড় প্রশ্ন।
ফলে খাদ্যনিরাপত্তার পরবর্তী ধাপ শুধু দেশে কত টন চাল উৎপাদন হচ্ছে বা গুদামে কত টন মজুত আছে, তা দিয়ে মাপা যাবে না। দেখতে হবে কতটি দেশ থেকে, কত দ্রুত এবং কত দামে বাংলাদেশ প্রয়োজনের সময় চাল কিনতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, বিকল্প উৎস আছে; কিন্তু সব উৎসের সক্ষমতা, দূরত্ব, দাম ও সরবরাহের নিশ্চয়তা সমান নয়। সেই ব্যবধানই ভবিষ্যতের বড় ঝুঁকি।
নবোদয়/ আরআই/ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬