Loading...

ট্রাম্পের ডিজেল কূটনীতিতে চাপে জেলেনস্কি
রাশিয়ার ডিজেল বাজারে আনতে নিষেধাজ্ঞায় ছাড় দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে রুশ তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ করতে ইউক্রেনকে চাপ দিচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই অবস্থান মস্কোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমানো এবং কিয়েভের যুদ্ধকৌশল সীমিত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।


রাশিয়ার ডিজেল বাজারে আনতে নিষেধাজ্ঞায় ছাড় দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে রুশ তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ করতে ইউক্রেনকে চাপ দিচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই অবস্থান মস্কোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমানো এবং কিয়েভের যুদ্ধকৌশল সীমিত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। মার্কিন জ্বালানির দাম কমানোর তাগিদের সঙ্গে ইউক্রেনের নিরাপত্তার স্বার্থের সংঘাত তাই সামনে এসেছে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসের বাইরে ট্রাম্প বলেন, ইউক্রেনের এমন নতুন নেতা প্রয়োজন, যিনি সমঝোতা করতে পারবেন। এর আগের দিন তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ডিজেল সরবরাহের সমঝোতা ঘোষণা করেন। তাঁর ঘোষণা অনুযায়ী, রাশিয়া প্রথমে তিন লাখ টনের বেশি ডিজেল দেবে, নভেম্বরে আরও পাঁচ লাখ টন এবং পরে কয়েক মিলিয়ন টন সরবরাহ করবে।
ছাড়ের বাস্তব পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। মার্কিন অর্থ দপ্তরের নিষেধাজ্ঞা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ওএফএসি ৯ অক্টোবর একটি লাইসেন্স জারি করেছে। এতে ২০২৭ সালের ৭ এপ্রিল পর্যন্ত রুশ ডিজেল বিক্রি, সরবরাহ ও যুক্তরাষ্ট্রে আমদানিসহ সংশ্লিষ্ট লেনদেনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। প্রকাশ্যে আসা ঘোষণায় এর বিনিময়ে রাশিয়ার হামলা বন্ধের কোনো অঙ্গীকারের উল্লেখ নেই।
সিদ্ধান্তটির সময় তাৎপর্যপূর্ণ। নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন; চড়া জ্বালানির দাম ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে। ডিজেল কৃষিযন্ত্র ও পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি। এর দাম বাড়লে উৎপাদন ও সরবরাহের ব্যয়ও বাড়ে। ট্রাম্প নিজেও কৃষক ও পরিবহনকর্মীদের জন্য দাম কমানোকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। ফলে রুশ ডিজেল তাঁর কাছে দ্রুত স্বস্তি আনার একটি উপায়।
সংকটের কারণ আরও বিস্তৃত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহে বাধাও জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে। রুশ শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা সরবরাহে চাপ সৃষ্টি করলেও জেলেনস্কিকে পুরো সংকটের দায় দেওয়া এই বহুমুখী বাস্তবতার অসম্পূর্ণ ব্যাখ্যা।

কিয়েভের উদ্বেগ, জ্বালানি বিক্রির বাড়তি আয় রাশিয়ার যুদ্ধ চালানোর সক্ষমতা বাড়াবে। জেলেনস্কি এ কারণেই সমঝোতাকে পুতিনের জন্য উপহার বলেছেন। অ্যাক্সিওসকে তিনি বলেছেন, দুই দেশের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে তাঁর সমর্থন থাকত। অর্থাৎ আপত্তির কেন্দ্রে ছাড়ের বিপরীতে নিরাপত্তার অর্জন। এদিকে শনিবার জাপোরিঝঝিয়ায় রুশ হামলায় ২০ জন নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে ইউক্রেনের উদ্ধারকারী সংস্থা।
আস্থার সংকটও রয়েছে। সমঝোতা ঘোষণার সময় মিয়ামিতে মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইউক্রেনের প্রতিনিধিরা শান্তি আলোচনা করছিলেন। এপিকে এক জ্যেষ্ঠ ইউক্রেনীয় কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঘোষণার আগে তাঁরা ডিজেল সমঝোতা সম্পর্কে জানতেন না। আলোচনার অংশীদারকে অন্ধকারে রেখে প্রতিপক্ষকে ছাড় দেওয়া হলে মধ্যস্থতাকারীর ওপর আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ইউরোপের প্রতিক্রিয়া সেই ফাটলকে আরও দৃশ্যমান করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কায়া কালাস বলেছেন, রাশিয়ার ওপর চাপ কমানোর সময় এখন নয়; ইউরোপ তা করবে না। একই সময়ে ওয়াশিংটনের ছাড় পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞায় ভিন্ন অবস্থান তৈরি করছে। রাশিয়ার জ্বালানি আয় সীমিত করার সম্মিলিত উদ্যোগ এতে দুর্বল হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
নেতৃত্ব বদলের আহ্বানেরও আইনি বাধা আছে। ইউক্রেনের সামরিক আইনের ১৯ ধারায় সামরিক আইন চলাকালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিষিদ্ধ। ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা বলেছেন, নিজেদের নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার অধিকার ইউক্রেনীয় জনগণের। ফলে জেলেনস্কির প্রতি চাপ এখন শান্তি আলোচনার পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্নেও পৌঁছেছে।
সরবরাহের প্রতিশ্রুতিও নিশ্চিত ফল নয়। ট্রাম্প পরবর্তী ৩০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহকে রুশ শোধনাগারের অবস্থার ওপর নির্ভরশীল বলেছেন। রাশিয়া নিজস্ব বাজারের চাহিদা মেটাতে ডিজেল রপ্তানিতে বিধিনিষেধ দিয়েছে; ইউক্রেনের হামলায় তার শোধনক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘোষিত জ্বালানি কবে বাজারে পৌঁছাবে এবং দাম কতটা কমাবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
এই বিরোধে জ্বালানিসংকট, মার্কিন নির্বাচন এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কূটনীতি এক জায়গায় এসে মিলেছে। ডিজেলের বাস্তব সরবরাহ, দামের পরিবর্তন এবং মস্কোর সামরিক আচরণই দেখাবে, এই ছাড় শান্তির সম্ভাবনা বাড়াল, নাকি যুদ্ধ চালানোর অর্থনৈতিক সুযোগ সম্প্রসারিত করল।
নবোদয়/ এসএন/ ১১ অক্টোবর ২০২৬